Showing posts with label PHIL HONS. Show all posts
Showing posts with label PHIL HONS. Show all posts

Thursday, June 18, 2020

6th sem honours (Nature of Ultimate Reality) by Radhakrishnan

চরম সত্যতার স্বরূপ (Nature of Ultimate Reality)
   রাধাকৃষ্ণাণ অনুভব করেছিলেন দার্শনিক অনুসন্ধানের মূল কাজ হল জগতের যথার্থ ব্যাখ্যা খুঁজে বার করা।এবং ব্যাখ্যাকারী নিয়মগুলোকে পরিণামে সত্য হতে হবে,কারণ এগুলি সব কিছুর সত্যতাকে প্রমাণ করার ভিত্তি রূপে সক্রিয় থাকবে।সুতরাং রাধাকৃষ্ণাণ চিন্তা করেছিলেন এই 'চরম সত্যতা'কে এমন সমর্থ হতে হবে - যা জগৎ সম্পর্কে 'কিভাবে' এবং 'কেন' সম্পর্কিত যাবতীয় প্রশ্নের উত্তরদানে সক্ষম হবে।
      চরম সত্যতার স্বরূপ প্রকাশ করতে গিয়ে রাধাকৃষ্ণাণ এর ঝোঁক দেখা যায় ভীষণভাবে বেদান্তের দিকে।বেদান্ত দর্শনে বিশ্বাস করা হয় চরম সত্য হলো ব্রহ্ম। বস্তুতঃ বেদান্ত অনুসারে ব্রহ্মকে প্রমাণ করাও যায় অথবা প্রতিষ্ঠা করাও যায় না,তবু ব্রহ্মকে স্বীকার করা হয়।কারণ ব্রহ্ম স্বরূপ চৈতন্যের পূর্বানুমান ছাড়া কোন কিছুই চিন্তা করা যায় না।একইভাবে রাধাকৃষ্ণণ বলেছেন ---- চরম সত্য হলো ব্রহ্ম ---- এটাই সমস্ত সত্য এবং অস্তিত্বশীলতার যৌক্তিক ভিত্তি।
      এই প্রসঙ্গে স্বভাববাদীরা বলতে পারেন,এই জগৎকে ব্যাখ্যা করার জন্য অতিপ্রাকৃতিক অথবা আধ্যাত্মিক কোন তথ্যের প্রয়োজন নেই,কেননা জগতের সবকিছুরই প্রকৃতিগত ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব।রাধাকৃষ্ণণ মনে করেন, প্রকৃতিগত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হল সময়ের সত্যতার পূর্বানুমান এবং এ জন্যই এই জাতীয় ব্যাখ্যা সময়ের মধ্যে যে সমস্ত ঘটনা ঘটে তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে,সময়কে অতিক্রম করে যাওয়া বিষয়ের উপলব্ধির প্রয়োজন অনুভব করে না। এই তত্ব জগৎকে দেখে একটা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতো যা অন্ধ এবং বিশৃঙ্খলভাবে কাজ করে যায়।সময়ের জগৎকে এই তত্ত্ব একটা অচেতন শক্তিতে পরিণত করে,এবং জীবন, চৈতন্য, এবং মূলবোধক উপজাত বিষয়ে পরিণত করে। তাই জগতের প্রকৃতিগত কখনই চরম সত্যতার স্বরূপ নির্ণয় করতে পারেনা।এরা কেবল প্রকৃতির মধ্যে একটা নিয়ম-শৃঙ্খলাকে খোঁজে মাত্র-কিন্তু এটা ভুলে যায় প্রকৃতির নিয়ম-শৃঙ্খলা যান্ত্রিক নয় উদ্দেশ্য অভিমুখী।
    রাধাকৃষ্ণণ এ বিষয়ে সচেতন ছিল যে চরম সত্যকে এমন হতে হবে যার দ্বারা জগতের সবকিছুর মূল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়।জড় জগৎ-এ এমন কোন তথ্য নেই যাকে বিবেচনা করা যেতে পারে এজন্য।জড় সবকিছুই ব্যাখ্যা যোগ্য অন্যকিছুর দ্বারা।সুতরাং চরম তত্ত্ব অবশ্যই জড়ের বাইরে থাকে,অবশ্যই দৈহিক শক্তি থেকে ভিন্ন কিছু হবে।এ কারণেই রাধাকৃষ্ণণ-এর কাছে চরম সত্য অবশ্যই 'আধ্যাত্মিক' তত্ত্ব।
     'আধ্যাত্মিক' শব্দটি নানাদিক থেকে ব্যাখ্যাযোগ্য।তবে এখানে আলোচনা শুরু হিসেবে এটুকু বলা যায় 'আধ্যাত্মিক' বিষয়টিকে নঞর্থক ভঙ্গিকে বোঝা যায়।তাহল - আধ্যাত্মিক হল এমন পৃথক বা উচ্চতর কিছু যা দৈহিকতা বা জড় থেকে উচ্চতর।রাধাকৃষ্ণণ কম-বেশি,অদ্বৈত বেদান্তিকের মতই উপলব্ধি করেছিলেন যে চরম সত্যের যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়।কিন্তু একটা চেষ্টা করা যেতে পারে আমাদের সীমিত ভাষার সক্ষমতা থেকে।সুতরাং জগৎ-পদ্ধতির বিশ্লেষণ থেকেই এটা প্রকাশিত হয় যে,আমাদের দৈহিক ব্যাখ্যা এক সময় শেষ হয়ে যায়।তার উর্ধে আমরা আর যেতে পারি না।এর থেকে বোঝা যায়  আমাদের অনুসন্ধান করা প্রয়োজন একটি ন-দৈহিক তত্ত্বের- যার দ্বারা জগৎ-পদ্ধতির ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

Tuesday, June 9, 2020

6th sem honours (Nature of Radhakrishnan Philosophy)

Nature of Radhakrishnan Philosophy :

     রাধাকৃষ্ণণের দার্শনিক ভাবনার  মধ্যে এক দুর্লভ গুণ সংযোজিত হয়েছিল।একদিকে তিনি প্রাচ্য দর্শনের পরম্পরাকে জানার সুযোগ পেয়েছিলেন,অপরদিকে পাশ্চাত্য দর্শনের পরম্পরাকেও গভীর অনুশীলন করেছিলেন।ফলে, তার শিশুকাল থেকে ভারতীয় সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠার ফলে যেমন প্রাচ্যের দর্শন বোধ তীব্র ছিল,তেমনি পঠন-পাঠনের মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্যের দার্শনিক বোধগুলিকেও তিনি আয়ত্ত করেছিলেন যথাযথভাবে। আর এই দুই এর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল তার দার্শনিক বোধ।
     কিন্তু তার চিন্তার মূল নিহিত ছিল গভীরভাবে ভারতীয় পরম্পরার মধ্যেই।তাঁর এই মূল ভারতীয় ভাবনাটি বৈদান্তিক ভাবনার পরম্পরা।কিন্তু তিনি তার এই মূল ভাবনাটিকে উপস্থাপিত করেছিলেন পাশ্চাত্য দার্শনিক চিন্তার মডেলে।অর্থাৎ তিনি ভারতীয় প্রথাসিদ্ধ প্রাচীন ভাবনাকে অভিনব পাশ্চাত্য দর্শনের প্রকাশ করেছেন।
এ জন্যই অধ্যাপক সি.ই.এম. জোয়াড তাঁর 'Counter attacks from the East' গ্রন্থে রাধাকৃষ্ণনের অধিবিদ্যাগত দৃষ্টিকোণকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের 'সংযোগকারী আধিকারিক' রূপে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, রাধাকৃষ্ণন প্রাচ্যের প্রথানুগত জ্ঞানের সঙ্গে পাশ্চাত্যের নতুন জ্ঞান এবং শক্তির সেতুবন্ধন করেছেন।এর থেকে বলা যায় তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভাবনার সমন্বয় যে করেছিলেন সেটা পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদদের দ্বারাও স্বীকৃত।
      তাঁর প্রাথমিক দার্শনিক অবস্থানকে 'অদ্বৈত বেদান্ত' এবং 'চরম ভাববাদ' এর দর্শনের এক ধরনের সমন্বয় বলা যায়।তিনি বৈদান্তিক সত্যতা থেকে নিয়েছেন অদ্বৈতবাদী চরিত্র এবং এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন চরম ভাববাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক। বৈদান্তিকদের মত তিনি বিশ্বাস করতেন যে 'সত্যতা হলো এক',আবার চরম ভাববাদীদের মতো তিনি দেখিয়েছেন 'সবকিছুই হল সেই এক অবশ্যম্ভাবী দিক'।এর ফলে দর্শনের একজন বিশ্লেষক পাঠকের কাছে তাঁর দর্শনকে যে কোন আধুনিক অধিবিদ্যাগত মডেলের আকৃতি অনুধাবন করা সমস্যাবিশেষ হয়ে দাঁড়ায়।তাঁর দর্শনকে মোটামুটিভাবে ব্যাখ্যা করা যায় 'অদ্বৈতবাদী' ভাবনা হিসাবে।এই দর্শন 'অদ্বৈতবাদী' কারণ এখানে 'সত্যতা' গৃহীত হয় 'এক'রূপে এবং এই দর্শনকে বলা যায় ভাববাদ  একাধিক যুক্তিতে।তাঁর ভাববাদ অবশ্যই অধিবিদ্যাগত,কিন্তু অধিবিদ্যাগত ভাববাদ হতে পারে দুই প্রকারের।হয় 'ধারণা বা ভাববাদ অথবা 'আদর্শ-বাদ'।প্রথমটির অর্থ হল----- প্রকৃত সত্যতা হলো ধারণা - এটা হতে পারে মানসিক অথবা আধ্যাত্মিক। রাধাকৃষ্ণাণ নিজেও 'সত্যতা' বলতে বুঝিয়েছেন 'আধ্যাত্মিক সত্যতা'কে।সুতরাং এই দিক থেকে তিনি একজন ভাববাদী।অন্যদিক থেকে আদর্শ-বাদ আবার গুরুত্ব আরোপ করে কোন আদর্শ বা মূল্যকে চরম হিসেবে। রাধাকৃষ্ণন আদর্শবাদের এই অর্থকেও গুরুত্ব দিয়েছেন  এবং নিজের দার্শনিক দৃষ্টিকোণকে আদর্শবাদী দৃষ্টিকোণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন এই অর্থে যে,তাঁর দর্শন বিশ্বাস করে আধ্যাত্মিক দর্শনের দিকেই সমস্ত জগৎ-পদ্ধতি ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছে।
     'ধারণা বা ভাব' এবং ভাববাদ শব্দটি নানা অর্থ তিনি বিশ্লেষণ করেছেন এবং সিদ্ধান্তে এসেছেন 'ভাব' এর প্রকৃত অর্থ বিষয়ে।যখন আমরা কোনো বিষয় বা কাজের ক্ষেত্রে প্রশ্ন করি এর ধারণাটা কি? আমরা এটাই বোঝাতে চাই যে কি মূল নিয়ম এর মধ্যে আছে অথবা এর অর্থ কিংবা উদ্দেশ্য কি? অথবা এর লক্ষ্য বা মূল্য কি? এর থেকে বোঝা যায় একটি ধারনার প্রকৃতি নির্ণয় করতে গিয়ে আমরা চেষ্টা করি সে বিষয়টা কোন দিকে যাচ্ছে।এভাবে যদি আমরা উপলব্ধি করি যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কোন কিছুর দিকে গতিশীল----তাহলে এটার একটা অর্থ এবং মূল্য আছে,এটা অন্ধের মতো এগিয়ে চলার নয় অথবা অসভ্য সামনের দিকে গতি নয়, বরং ক্রমাগত আরও উচ্চতর পরিণতির দিকে অগ্রগতি - এই ভাবনাই আমাদের একজন ভাববাদী করে তোলে। এই অর্থে, একজন ভাববাদী হন একজন উদ্দেশ্যবাদীও, যে বিশ্বাস করে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একটা চরম অর্থ এবং উদ্দেশ্য আছে।
      সুতরাং তাঁর দর্শন বলে - এই জগতের চরম প্রকৃতি হল আধ্যাত্মিক, এবং যতদিন না আধ্যাত্মিক অনুভূতির কারণ হচ্ছে ততদিন মানব জীবনে এই বিশৃঙ্খল, অমঙ্গলজনক এক আতঙ্ক থাকবে।এভাবে তিনি সবকিছুকেই চরম আধ্যাত্মিকতার ওপর অসম্ভব গুরুত্ব আরোপ করার ফলে তাকে, অতিন্দিয়বাদী বলে অনেকে চিহ্নিত করেছেন। তবে বি.কে. লাল তাঁর, 'Contemporary Indian Philosophy' গ্ৰন্থে এ প্রসঙ্গে বলেছেন '..but his mysticism is mysticism only to the extent to which idealistic thought of the monisitic variety tends towards it'.
     
                                    -----------

Wednesday, June 3, 2020

6th sem honours (Biography of S.Radhakrishnan)


  মাদ্রাজ শহরের 40 মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত 'তিরুতানি' নামে ক্ষুদ্র শহরের এক নিম্ন মধ্যবিত্ত তেলেগু ব্রাহ্মণ পরিবারের 1888 খ্রিস্টাব্দের 5 ই সেপ্টেম্বর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন জন্মগ্রহণ করেন।সংসারের অভাব-অনটন তাঁর শিক্ষার আগ্রহের বিশেষ ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারেনি।'তিরুতানি' শহরেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়।নিজের সম্বন্ধে বলেছেন :
  আমার পিতামাতা সাধারণ ঐতিহ্যগতভাবেই ধর্ম বিশ্বাসী ছিলেন।বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারী বিদ্যালয়ে আমি দ্বাদশ বছর শিক্ষা করেছিলাম।তার মধ্যে তিরুপতি শহরের লুথেরান মিশন হাইস্কুল, ভেলোর ভূরহীজ কলেজে ও মাদ্রাস ক্রিস্টান কলেজ পর্যন্ত।সুতরাং এক অদৃষ্ট জীবন্ত পরমার্থিক সত্তার আবহাওয়ার মধ্যেই যে আমি মানুষ হয়ে ছিলাম,সে কথা বলা চলে।এইভাবে মানুষ হওয়ার ফলে আমার দার্শনিক তত্ত্বজ্ঞান ও তার সমস্যা বিচারের ধারা,ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ এর পরিবর্তে ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে গড়ে উঠেছিল এবং আমি দর্শনকে তর্ক শাস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারিনি।
    মাত্র সতেরসতের বয়সে তিনি যখন বিয়ে ক্লাসে ভর্তি হওয়ার কথা চিন্তা করেছিলেন,সে সময় তার এক সদ্য বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ জ্ঞাতি ভ্রাতা নিজের দর্শনের বইগুলি তাঁকে উপহার দেন এবং তিনিও দর্শন শাস্ত্রকেই নিজের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করেন। মাদ্রাজ খ্রিস্টান কলেজের ছাত্র রূপে রাধাকৃষ্ণণ বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।বি.এ পরীক্ষায় নীতিবিদ্যার উত্তর পত্রে তিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং সেজন্য 'ডঃ স্যামুয়েল সাথিয়ানাথন' স্বর্ণপদক লাভ করেন।
   ছোটবেলা থেকেই খ্রিস্টান মিশনারি স্কুল কলেজে পড়ার ফলে খ্রিস্টান ধর্মশাস্ত্র, বাইবেল সম্বন্ধে তিনি প্রভূত জ্ঞানার্জন করেন। কিন্তু খ্রিস্টান মিশনারীরা হিন্দুধর্মের অহেতুক কঠোর সমালোচনা করতেন সে সময়ে----- তিনি গভীর বেদনাবোধ করতেন।তাঁর নিজের হিন্দুত্বের অহংকারের আঘাত অনুভব করতেন। ফলে গভীরভাবে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ হিন্দু দর্শন পাঠে তিনি আত্মনিয়োগ করলেন।
    সেসময় হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রধান অভিযোগ ছিল হিন্দু ধর্মে নৈতিকতার কোন স্থান নেই।এই অন্যায় অপবাদ এর প্রতিকার করার জন্য তিনি এক বিশেষ পন্থা গ্রহণ করলেন।সেসময় মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ.পরীক্ষায় অন্যান্য উত্তরপত্রের সঙ্গে একটি মৌলিক প্রবন্ধ রচনা করতে হতো। রাধাকৃষ্ণণ এই সুযোগে 'Ethics of Vedanta' নামে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ম অনুযায়ী জমা দিলেন।ঐ  উত্তরপত্রে পরীক্ষক বিশিষ্ট অধ্যাপক Prof.Hogg প্রবন্ধটি পড়ে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে সে বছরই প্রবন্ধটি পুস্তকাকারে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন।
   এম.এ. পরীক্ষা পাসের পর রাধাকৃষ্ণাণ মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এম এ পরীক্ষা পাশের পর সালে তিনি 1911 সালে এল.টি অর্থাৎ 'লাইসেনসিয়েট ইন টিচিং' উপাধি লাভ করেন। 1918 সালে তিনি মাইসোর ইউনিভার্সিটিতে 'প্রফেসর অফ ফিলোসফি' হিসেবে নিয়োগপত্র পান। 1921 সালে সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'জর্জ ভি' অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। 1928 সালে জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে রাধাকৃষ্ণণের পরিচয় ঘটে।
    রাধাকৃষ্ণাণ বিদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয় পড়ানোর এবং বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।1929 সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যানচেষ্টার কলেজে অধ্যক্ষের পদ তাঁকে দেওয়া হয়। 1936 সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক এম.এ. ডিগ্রি তাঁকে দেওয়া হয়। 1936 থেকে 1938 তিনি অক্সফোর্ড-এ 'Spalding Professor' পদ গ্রহণ করেন এবং ভারতীয় দর্শন প্রসঙ্গে বক্তৃতা দেন।1949-1952 সোভিয়েত রাশিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন।1952-62 ভারতের উপ রাষ্ট্রপতি পদে নিযুক্ত হন এবং 1962-67 ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন।
   1975 সালের 16 এপ্রিল অল্প রোগভোগের পর রাধাকৃষ্ণাণ পরলোকগমন করেন।
                                      ---------

Wednesday, May 27, 2020

6th sem honours (Nature of Integral Yoga by Sri Aurobindo)

 অখন্ড যোগ বা পূর্ণ যোগের প্রকৃতি (Nature of Integral Yoga):
    শ্রী অরবিন্দ তাঁর যোগের প্রকৃতি প্রসঙ্গে বলেছেন, 'যোগ এর অর্থ ঐশ্বরিক সত্তার সঙ্গে যুক্ত হওয়া', এই সংযুক্ত হওয়া হতে পারে অতিজাগতিক, অথবা জাগতিক অথবা একক ব্যক্তিগত অথবা তিনটি একসঙ্গে।আর এই কারনেই তার 'যোগ'কে বলা হয় অখন্ড। এই যোগ আরোহণের পদ্ধতিকে ত্বরান্বিত করে,এই যোগের কয়েকটি মৌলিক চরিত্র হলো এরকম :
১.ভারতীয় যোগের বিভিন্ন আকৃতিগুলি কিছু বিশেষ ক্ষমতার কর্যণ করে চলে,অর্থাৎ যোগচর্চা মানে কিছু অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার প্রচেষ্টা।আর তাই সকলের কাছে যোগচর্চা সহজ ব্যাপার নয়।কিন্তু শ্রী অরবিন্দ অন্তর যোগের যে রূপরেখা এঁকেছেন  তা সকলেই কাছে অনুসরণ করতে পারে।আর এ কারণেই তিনি পতঞ্জলি যোগের প্রাণায়াম এবং আসন এর জটিল শ্বাসপ্রশ্বাস ও দেহের অন্যান্য ক্রিয়াদির ব্যায়াম সংক্রান্ত বিষয় নিয়ন্ত্রিত হয়, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেননি।এমনকি প্রার্থনা মন্ত্রের আবৃতি করা কেউ সুপারিশ করেননি।তাঁর পূর্ণ যোগ হল অন্তরের যোগ,যেখানে প্রয়োজন কিছু নিয়মশৃঙ্খলা ও পবিত্রতা এবং আধ্যাত্মিকতা বোধ, যাকে সকলেই অভ্যাস করতে পারে।
২. অধিকাংশ যৌগিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে জগত সম্পর্কে  নঞর্থক দৃষ্টিভঙ্গি।পতঞ্জলির যোগের লক্ষ্য বিবেক জ্ঞান অর্জন করা।যার মাধ্যমে কেবল আত্মা থেকে অনাত্মা  পৃথক করা যায়।কিন্তু শ্রী অরবিন্দ বিশ্বাস করেন,যোগের লক্ষ্য জ্ঞানের মধ্যে পৃথকীকরণ নয়, বরং অনাত্মাকে আধ্যাতিকতায় উন্নীত করা।
৩. অধিকাংশ যৌগিক দার্শনিক বিশ্বাস করেন , যোগে যা প্রয়োজন হয় তাহল স্থূল দেহের ওপরে ওঠা।কিন্তু শ্রীঅরবিন্দ এ কথা কখনো বলেননি যে দেহকে সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে বা দমন করতে হবে।বরং তিনি বিশ্বাস করতেন যোগের লক্ষ্য হলো দেহকে অতিমানসিক আলোক দ্বারা উদ্দীপ্ত করা।
৪. অন্যান্য যোগীরা বলেন ঐশ্বরিক সত্তার সঙ্গে মানুষ যোগের মাধ্যমে যুক্ত হয় সমাধির অবস্থায়,তখন জাগ্রত চেতনা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং চারপাশের সাধারণ জগতের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় বিপরীত দিকে শ্রীঅরবিন্দ বলেছেন, ঐশ্বরিক সত্তার সঙ্গে আধ্যাত্মিক সংযুক্তিকরণ হওয়া সম্ভব এই দেহে এবং আমাদের জাগ্রত চেতনার মাধ্যমেই।
৫. অন্যান্য যৌগিক দার্শনিকরা বলছেন, যোগের লক্ষ্য হলো একক ব্যক্তির মুক্তি। কিন্তু শ্রী অরবিন্দ বলেছেন এটাই যোগের একমাত্র লক্ষ্য নয়। বস্তুতঃ যোগের চরম লক্ষ্যের একটি দিক মাত্র একক ব্যক্তির মোক্ষ, যোগের চরম লক্ষ্য হলো সমগ্র মানবজাতির পুনরুদ্ধার করা এবং এই পৃথিবীতে দিব্য জীবনের উন্মেষ ঘটানো।
                         ‌           -----------

Tuesday, May 19, 2020

6th sem honours Integral Yoga by Sri Aurobindo

অখন্ড যোগ (Integral Yoga):
   দিব্য জীবন হলো বিবর্তনের চরম লক্ষ্য।কিন্তু এই দিব্য জীবনকে কিভাবে আমরা পৃথিবী নিয়ে আসব? শ্রীঅরবিন্দ অনুভব করেছিলেন জগতের বুকে একদিন দিব্য জীবন নেমে আসবেই, হয় দ্রুত অথবা বিলম্বিত হতে পারে,তবে আধ্যাত্মিক কার্যক্রম এই অবতরণকে দ্রুত কার্যকরী করতে সমর্থ। কিন্তু কিভাবে কত নির্দিষ্ট ও দ্রুতভাবে এটা সম্ভব?
 শ্রীঅরবিন্দের উত্তর হল এটা করা সম্ভব 'যোগ' এর মাধ্যমে।শ্রীঅরবিন্দ যেভাবে যোগের প্রকৃতিকে বুঝেছেন তার বিস্তারিত ও সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা এখানে দেওয়া সম্ভব নয় এ জন্যই যে প্রথমতঃ এই ব্যাখ্যা বিশাল হবে, এবং দ্বিতীয়তঃ অনিবার্যভাবে 'তন্ত্রে'র উপর নির্ভরশীল।যা এই দার্শনিক আলোচনা পরিসরের বাইরে। এখানে কেবল শ্রীঅরবিন্দের অখন্ড যোগের দার্শনিক আলোচনা করা যেতে পারে।
অখন্ড যোগের লক্ষ্য:
    যোগ শব্দের সাধারণ অর্থ যুক্ত হওয়া। পতঞ্জলি যোগ শব্দটিকে সাধারণ অর্থে ব্যবহার করেননি।পতঞ্জল ঈশ্বরকে স্বীকার করলেও তার যোগসূত্রে 'ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত হওয়াকে' যোগ বলেননি।যোগের লক্ষন প্রসঙ্গে পতঞ্জল বলেছেন বলেছেন 'যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধ' অর্থাৎ যোগচিত্তবৃত্তির নিরোধ। বুদ্ধি অহংকার মন এই তিনটি তত্ত্বকে যোগ দর্শনে 'চিত্ত' বলা হয়েছে। এই চিত্ত যখন কোন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন চিত্ত সেই বিষয়ের আকার গ্রহণ করে। চিত্তের বিষয়াকার  গ্রহণণই চিত্তবৃত্তি। যেমন ইন্দ্রিয় মনের মাধ্যমে চিত্র যখন ঘটের সঙ্গে সংযুক্ত হয়, তখন চিত্ত ঘটের আকার গ্রহণ করে অর্থাৎ চিত্তের ঘটাকারবৃত্তি হয়। চিত্তের বৃত্তি হল এই প্রকার জ্ঞানরূপ অবস্থাসকল। আত্মা স্বরূপতঃ বিশুদ্ধ চেতন্য, তাহ চেতন্যের বিকার সম্ভব নয়। সুতরাং চিত্তে প্রতিবিম্বিত আত্মারই বিকার হয়।চিত্তে প্রতিবিম্বিত আত্মাই অবিদ্যাবশত নিজেকে ওইসব বৃত্তিজ্ঞানের জ্ঞাতা, কর্তা ও ভোক্তা বলে মনে করেন। এই অবস্থাই হচ্ছে আত্মার বদ্ধাবস্থা।বদ্ধাবস্থায় আত্মা পঞ্চক্লেশে ক্লিষ্ট হয়, এরূপ বন্ধন মুক্তির জন্যই চিত্তবৃত্তি নিরোধের প্রয়োজন। চিত্তবৃত্তি নিরুদ্ধ হলে চিত্ত সম্পূর্ণরূপে বৃত্তিহীন রূপে অবস্থান করে।চিত্তের এই অবস্থাই 'সমাধি' বা যোগা।কারণ চিত্তবৃত্তি সম্পূর্ণরূপে নিরুদ্ধ হলে প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষের বা আত্মার সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং আত্মা স্বরূপে অবস্থান করে।এই অবস্থাই হচ্ছে মুক্তি বা কৈবল্যের  অবস্থা।
    শ্রীঅরবিন্দের 'অখন্ড যোগ' কিন্তু পতঞ্জলের 'যোগ' থেকে নানা দিক থেকে পৃথক। এই পার্থক্য গুলি হল:
 প্রথমতঃ আমরা বলতে পারি অরবিন্দের যোগ সমন্বয় হল ফলের সমন্বয়।আর পতঞ্জলের যোগ সমন্বয় হল পদ্ধতির সমন্বয়। শ্রীঅরবিন্দ হঠযোগের অভ্যাস বাধ্যতামূলক করেননি।তার পদ্ধতিতে - যদিও তার ফলাফল পাওয়া যায় তার পদ্ধতিতে।
 দ্বিতীয়তঃ পতঞ্জলির মতে ঈশ্বর উপলব্ধির একমাত্র উপায় আত্মোপলব্ধি এটাই চরম লক্ষ্য।কিন্তু শ্রীঅরবিন্দের মতে ব্যক্তির আত্মউপলব্ধি বিশ্বচেতনার উপলব্ধির থেকে নিম্নমানের।
 তৃতীয়তঃ পতঞ্জলির মতে,আত্মউপলব্ধিতে তুরীয় অবস্থায় কোন বিষয়ের চেতনা থাকে না।এটি অন্য তিনটি চেতনার নিম্ন অবস্থা,যথাক্রমে জাগ্রত, স্বপ্নময়, এবং স্বপ্নহীন অবস্থা থেকে পৃথক।যখন কোনো ব্যক্তি তুরীয় চেতনার অবস্থা থেকে জেগে ওঠে এবং ফিরে আসে জাগ্রত অবস্থায়,তার সমাধি ভেঙে যায়।তখন আত্মা মানসিক অবস্থার দ্বারা নিজেকে চিহ্নিত করে।তাই আত্মোপলব্ধি কেবল সম্ভব সমাধির অবস্থাতেই।
 কিন্তু শ্রীঅরবিন্দের মতে সমাধি চরম লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য অপরিহার্য নয়। যেটা অত্যন্ত প্রয়োজন,তাহল জাগ্রত চৈতন্যের রূপান্তর।এটা ছাড়া যোগ কখনো চরম ফল প্রদান করতে পারেনা।

 চতুর্থতঃ শ্রী অরবিন্দ বলেছেন,যোগ ব্যক্তিকে তৈরি করে উপরের দিব্য চিৎ শক্তিকে গ্রহণের উপযোগী করে,মানুষকে হতে হবে দিব্য শক্তিকে গ্রহণের আধার মাত্র।এর জন্য নিজের আমিত্বকে সম্পূর্ণ বর্জন করাই প্রাথমিক পদক্ষেপ। যদি এই পদক্ষেপ গ্ৰহণ করা হয়,তবেই এই পৃথিবী অতিমানসের অবতরণ ঘটবে, এবং ক্রমে এক দিব্য মানবসমাজের উদ্ভব ঘটবে।
                                      ---------

Sunday, May 10, 2020

6th sem honours Topic - Supermind by Sri Aurobindo

                        অতিমানস (Supermind)
                                  শ্রীঅরবিন্দ       
 শ্রীঅরবিন্দ মনে করেন,অতিমানস স্তর স্বতঃই সত্যের অধিকারী।এর জ্ঞান সত্যেরই জ্ঞান---- কেবল মানসিক জ্ঞানের মত ছবি বা চিহ্ন নয়।সাধারণ মন ও অতি মানসের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায় আছে,যাদের মধ্য দিয়ে অতিমানস,সাধারণ মনে নেমে আসতে পারে এবং সাধারন মনও ক্রমশ অতিমানসের উচ্চস্তরে আরোহন করতে পারে।এটাই বিবর্তনের নিয়ম। সাধারণ চেতনার ঊর্ধ্বে উচ্চতর মানসিক চেতনার যে স্তর আছে তা মাঝে মাঝেই সাধারন চেতনাতে বোঝা যায়।কোন একটি সমস্যা সম্বন্ধে চিন্তা করলে মনে হয় হঠাৎ কোথা থেকে সমাধানের চিন্তা এসে পড়লো।সাধারন মানুষের মধ্যে এমন অনেকে আছেন,যাদের কোন বিষয় বুঝতে অনেক সময় লাগে বা কষ্ট করতে হয়।আবার কেউ কেউ আছেন,ঐ বিষয় খুব দ্রুত আয়ত্ত করে ফেলেন।ধীশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিদের মানসিক ক্ষিপ্রতা ও স্বচ্ছতা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি। কবি বা গূঢ়বাদীর অনুভূতি অতি উচ্চস্তরের চেতনা। এইসব উচ্চ চেতনার সঙ্গে সম্যক পরিচিতি হতে গেলে প্রথমে বাহ্য চেতনা থেকে সরে এসে অন্তর্মুখী হয়ে আমাদের গূঢ় চৈত্য পুরুষ,আন্তর মন,আন্তর  প্রাণ ও আন্তর সূক্ষ্ম শরীরের সন্ধান পেতে হবে।
  প্রখরতার তারতম্য হেতু স্তরগুলি উচ্চ বা নিম্ন।সাধারণ মানস চেতনার ঊর্ধ্বে আছে 'উত্তর মানস'।এতে সাধারণ মনের মত সত্যের অন্বেষণ করতে হয় না।এই স্তরের চিন্তার মধ্য দিয়ে সাক্ষাৎ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সত্যকে প্রত্যক্ষ করে ব্যক্তি।এই অবস্থাকে বলা হয় দিব্য-মনন বা সত্য চিন্তন। কিন্তু এর চেয়ে আরো দীপ্ত চেতনা হলো 'দীপ্ত মন' বা প্রবুদ্ধ মানস' যাকে Illumined Mind বলেছেন শ্রীঅরবিন্দ।এই স্তরের শক্তি ও প্রখরতা অনেক বেশি।এইস্তরকে বলা হয় সত্য ও প্রাণ।বৈদিক ঋষিদের নিকট 'সূর্য' সত্যের প্রতিমূর্তি। সেইভাবে বলা যায়, উত্তর মানস স্থির সূর্যলোক এবং দীপ্ত বা মানুষের ঊর্ধ্বে জলন্ত সূর্য সত্তার পুঞ্জিভূত রশ্মিরাশি।
  এই স্তরের ঊর্ধ্বে সত্যশক্তির আরও মহত্তর শক্তি আছে।একে বলা হয় বোধি বা প্রজ্ঞা। যাকে শ্রী অরবিন্দ বলেছেন ''Intuition''। এই বোধই হলো নিবিড় ও নির্ভুল সত্যদৃষ্টি, সত্যচিন্তন, সত্য অনুভূতি ও সত্যক্রিয়া।প্রজ্ঞা বোধির উৎসস্থলে আছে 'অধিমানস' যা অতিমানস ঋত্ চেতনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু এই স্তরেও হৃদয় অধিমানসের 'হিরণ্ময় পাত্র' দ্বারা ঋত চেতনার মুখ আচ্ছাদিত থাকে।অধিমানস পরার্ধ ও অপরার্ধে সংযোগসূত্র এবং অজ্ঞান ও অবিদ্যার মধ্যে অতিমানস চেতনার প্রতিভূ।
  অতিমানসের চেতনা অখন্ড, এতে বিষয় সমূহের মূল্য সত্য, সমগ্র সত্য এবং প্রতিব্যাষ্টি রূপের সত্য একক, এক অবিভাজ্য ঐক্যের সূত্রে গঠিত। কিন্তু অধিমানসের অখন্ডতা নেই। এর মূল সত্য,সমগ্র ব্যষ্টি সত্য।এমনকি এদের একত্ব সম্বন্ধ অবগত। কিন্তু এতে নেই অবিভাজ্য চেতনা। অধিমানসের একান্ত জ্ঞান এবং কেন্দ্রীভূত স্থায়ী চেতনা নয় বা এর কার্যাবলীর ভিত্তি নয়। এখানে এক একটি শক্তি বা দিক পৃথকভাবে নিয়ে, সেই জ্ঞানকে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিকশিত করে।
অতিমানস চেতনায় পুরুষ ও প্রকৃতি, চিদ্ ও শক্তি ----একেই সমগ্র সত্য। কিন্তু অধিমানস চেতনায় এরা পৃথক। এক সমগ্র বহুমুখী সত্তা, বহু দিকে ভাগ হয়ে এক একটি ভাগ, নিজের নিজের ধারা অনুযায়ী বিকশিত হয়।একই চেতনার লক্ষ ধারায় খণ্ডিত হয় এবং প্রতিধারা নিজের নিজের সার্থকতার সন্ধান করে। এইভাবে অধিমানস এক সচ্চিদানন্দকে অনন্ত সম্ভাবনার রূপ দেয়। যাতে অনন্ত জগত সৃষ্টি হতে পারে।
  এই  অতিমানসিক স্তরে সব বিজ্ঞানময় পুরুষ যে একই ধরনের হবে-এমন নয়।সকল বৈচিত্রের মূলে এক ---- এই সত্যই অতিমানসের সত্য।
  সুতরাং অতি মানসিক জীব বিভিন্ন হলেও একাত্ম বজায় রাখবে।চেতনার প্রতি কেন্দ্রে,প্রাণের প্রতি স্পন্দনে,দেহের প্রতি কোষে সে অনুভব করবে ভগবত উপস্থিতি।তার কাছে সকল জীবই নিজের আত্মা। সে একাধারে ভগবানের ব্যষ্টি, সমষ্টি এবং বিশ্বাতীত রূপ।নিজে থেকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ বিশ্বের সঙ্গে তাঁর চেতনা, সংকল্প এবং কার্যের সঙ্গতি থাকবে।
 আমাদের অবিদ্যাই বিরোধের মূল কারণ।অহং বশে আমরা নিজেরা জীবনের মূল দাবি মেটাতে চাই, কিন্তু অতি মানসিক স্তরে জীবের অহংবোধ নেই।'অবিদ্যা বহির্ভূত ঋতম জ্যোতির শক্তিতে শক্তিমান।সে যেমন নিজের মধ্যে চিৎপুরুষের আত্মপ্রকাশের আনন্দ উপলব্ধি করবে,তেমনি সকলের মধ্যে চাইবে ভগবানের আনন্দ। ক্ষুদ্র আশা বা কামনা,তাদের তৃপ্তি বা ব্যর্থতার স্থান অতিমানসিক স্তরে নেই।
 অতিমানসিক জীবনে পাপ-পূণ্যের স্থান নেই। সুতরাং সেখানে নীতির প্রশ্ন নেই। তাঁর কার্য ও জীবন - তাঁর নিজেরই প্রকাশ।অবিদ্যা ও অহং না থাকলে কোন মিথ্যাচারণ বা অন্যায় ব্যবহার সম্ভব নয়।অবিদ্যাময় মানসিক জীবনে সত্য অজানা ----- তাই এ স্তরে সত্য সন্ধান করতে হয়। কিন্তু দিব্য জ্ঞানময় অতিমানসিক স্তরে কেবল সত্যেরই প্রকাশ। সত্য কি তা জীব উপলব্ধি করে এবং পরা প্রকৃতির ইচ্ছাই তার কার্য।
 শ্রীঅরবিন্দের অতিমানস উপলব্ধির প্রেক্ষাপটে মনোবিজ্ঞানে বিংশ শতাব্দীর চিন্তাবিদদের উপলব্ধিও সহায়ক ----- বিশেষ করে গেষ্টাল্ট মতবাদিদের শিক্ষাতত্ত্ব।সেখানে বলা হয়েছে-----শিক্ষা একান্তভাবেই স্বজ্ঞাজাত এক অন্তর্দর্শন মাত্র।যদিও আপাতদৃষ্টিতে শ্রীঅরবিন্দের দার্শনিক ভাবনার সঙ্গে এই তত্ত্বের কোন সরাসরি সম্পর্ক আমরা দেখতে পাই না,কিন্তু একটা মৌলিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।তাহল - শিক্ষা নেহাতই যান্ত্রিক 'চেষ্টা ও ভুল সংশোধন' মাত্র নয়।এটি 'সহজাত অন্তর উদ্ভাবন'। অতিমানসের আলোচনায় শ্রীঅরবিন্দ এই অন্তরের উদ্ভাসিত অবস্থার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলে মনে হয়।
                                      -----------

   

Friday, May 1, 2020

6th sem honours (The infinite aspect of Man's Nature by Rabindranath Tagore)

মানব প্রকৃতির অসীম সত্তার দিক(The infinite aspect of Man's Nature):
     মানব প্রকৃতির অসীম সত্তার দিকটিকে নানাভাবে কবিগুরু ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর দর্শনে।কখনো বলেছেন এটি মানুষের মধ্যে 'বিশ্বপ্রকৃতি' কখনো বলেছেন মানুষের মধ্যে উদ্বৃত্ত, আবার কখনো বলেছেন মানুষের মধ্যে 'দেবত্বশক্তি' ।তিনি এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন যে, মানবপ্রকৃতির এইদিকে সঠিকভাবে নির্ণয় করা অত্যন্ত জটিল,কিন্তু তিনি জীবনের নানা অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে বিষয়টিকে বোঝাতে চেয়েছেন।যখনই কোন কিছু 'ভালো' আমরা করতে চাই, এবং তার জন্য দুঃখ কষ্ট ভোগ করতে চাই এবং ত্যাগ স্বীকার করার জন্য প্রস্তুত থাকি,তখনই আমাদের মধ্যে এই 'দেবত্বে'র উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
     মানব সত্তার অসীমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সে ক্রমাগত নিজের ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে যেতে চায়।কোন কিছুই তার উদ্যমকে দমিয়ে রাখতে পারেনা পরিণামে।এমন কোন কাজ নেই যা সম্পূর্ণ অসম্ভব মানুষের কাছে।সে বারে বারে চেষ্টা করে,বিফলও হয়, কিন্তু তার বিফলতাও  তার কার্যক্রমকে পুনরায় সচেষ্ট করে তোলে।এই 'অতিরিক্ত' জীবনীশক্তিই প্রকৃতপক্ষে মানুষের উদ্যম।এটাই তার মধ্যে এমন এক অনুভূতি সৃষ্টি করে যা তার লক্ষ্যকে উচ্চতর স্থানে প্রতিষ্ঠিত করে-----এটাই মানুষকে আপন সাধারণ সত্তার ঊর্ধ্বে উঠতে সাহায্য করে।
     এই অসীম প্রকৃতির জন্যই মানুষ মুক্তি অথবা অমরতা জন্য আকুল আকাঙ্ক্ষা অনুভব করে।অন্য কোন জীবের মধ্যে অমরতার জন্য এই আকুলতা নেই। কিন্তু মানুষের মধ্যে কোন ভাবেই এই অনুভুতির জন্ম হয়েছে। যদিও তার অভিজ্ঞতা আছে মৃত্যুর, তবু সে অনুভব করে মৃত্যুই জীবনের শেষ নয়। তাই তার জীবনের নানা দিকের ভিত্তি এই বোধ।রবীন্দ্রনাথ নিজেই প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন এবং তার উত্তরও নিজেই দিয়েছেন। তিনি বলেছেন মানুষের মধ্যে কোন চেতনা তাকে অমরতা লাভের জন্য চালিত করে  যদিও সে জানে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ঘটনা, এটা তার দেহ নয় অথবা মানসিক সংগঠন নয়। এটা হল এক গভীর একত্ব, তার দেহের এই চরম রহস্যই তাকে পরিচালিত করে।এই অসীমতার চেতনাই তাকে অমরতার দিকে ধাবিত করে এবং সমগ্র জগতকে নিজের বলে মনে করতে সাহায্য করে।
      মানুষের মধ্যে এই দিকটি উপস্থিতির জন্যই যে প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে। দেহসর্বস্ব মানুষ কখনো প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতার অনুভূতি লাভ করতে পারে না। কিন্তু মানুষ প্রকৃতির সৌন্দর্যে পুলকিত হয়।প্রাকৃতিক শক্তির প্রকাশ দেখে অভিভূত হয়ে যায়। মানুষ অনুভব করে, যদিও প্রকৃতি সম্পর্কে তার প্রাথমিক অভিজ্ঞতা হয় যে, প্রকৃতি মানুষের বিরুদ্ধে ক্রিয়াশীল,কিন্তু পরিণামে মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায় না কারণ প্রকৃতিকে সে ভালবাসে তার অসীমতার জন্যই।
     কবির মতে, মানব প্রকৃতিতে এই দিকটি মূলতঃ সৃষ্টিশীল দিক। মানুষের মধ্যে অন্তর্নিহিত আছে এক সৃষ্টিশীল ক্ষমতা - যা তাকে নানাভাবে প্রকাশ করতে সাহায্য করে। 'সৃষ্টিক্ষমতা' বলতে কবি কোন নতুন কিছু গঠন করাকে বোঝান নি। এটা হল অভিনব ধারণা, নতুন এবং মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি।
     মানুষেরই অসীম প্রকৃতি তার ব্যক্তিত্বে এনে দিয়েছে গতিশীলতা এবং সদা-বিকশিত হওয়ার প্রবণতা। তবে এই বিকাশ যান্ত্রিক নয়। অথবা পুনঃ সৃষ্টির পদ্ধতি নয়। এই প্রবণতা আসে তার সৃষ্টিশীল চরিত্র থেকে।মানুষের বিকাশের প্রত্যেক স্তরে পূর্বাবস্থাকে সে যেমন বহন করে, তেমনি যুক্ত করে এবং কিছু তাজা ও নতুন বিষয়। মানুষ যদি শুধু একটা 'দেহ' হত, তবে তার বিকাশ বলতে বোঝাত দেহের বিকাশ।কিন্তু মানুষের 'ব্যক্তিত্বের' বিকাশ হল অন্তরের বিকাশ, যার সাক্ষ্য মেলে মানুষের অসীম প্রকৃতির সদা সক্রিয়তার মধ্যে।
      মানুষের অসীম প্রকৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল 'স্বাধীনতা'।মানুষ কিছু পরিমাণে 'স্বাধীনতা' উপভোগ করে অন্যান্য প্রাণীর থেকে তার দেহের গঠনের মধ্যেও। কিন্তু এই 'স্বাধীনতা' 'খাঁচার মধ্যে স্বাধীনতা' রবীন্দ্রনাথের মতে। 'দৈহিক মানুষ' মূলতঃ সীমাবদ্ধ তার দেহের সীমাবদ্ধতার দ্বারাই।কিন্তু যে স্বাধীনতা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অসীম প্রকৃতিকে প্রকাশ করে সেটি হলো 'আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা'। এই স্বাধীনতাই তার দেহের সীমাবদ্ধতাকে ভঙ্গ করে বিশ্বব্যাপী এক বিরাট একত্বের উপলব্ধি এনেছে তার মধ্যে।'যথার্থ স্বাধীনতা', রবীন্দ্রনাথের মতে, ক্ষুদ্র একক ব্যক্তির মধ্যে সামান্য উপলব্ধি।
  মানব প্রকৃতির এই দিকটিকে তিনি 'জীবন-দেবতা' আখ্যায় ভূষিত করেছেন।এটি জীবনের দেবতা এই জন্যই যে অস্তিত্বের আনন্দময় অনুভূতি দেয়। মানুষ প্রতি মুহূর্তে নিজের সীমাবদ্ধতাকে যে অতিক্রমের চেষ্টা করে, তার সম্ভাবনা ও উপলব্ধি রয়েছে এই আনন্দের মধ্যে। মানুষের মধ্যে এই 'দেবত্বের' উপস্থিতিই তাকে ঈশ্বর-সদৃশ করে তোলে।
                                       -----------

Thursday, April 30, 2020

6th Sem Honours Topic (Proofs for Gods existence)

ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ (Proofs for Gods existence):

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বোচ্চ সত্তার অস্তিত্বের প্রমাণ দাখিল করার তাগিদ অনুভব করেননি। কারণ ঈশ্বরকে খুব বেশি বৌদ্ধিক এবং বিমুর্ত যুক্তিজালে তিনি বাঁধতে চাননি। তাঁর কাছে ঈশ্বর ছিল অস্তিত্বের পূর্ব শর্ত------তাই তার প্রমাণ অপ্রয়োজনীয়।সর্বোচ্চ সত্তার অস্তিত্ব নিজের ভেতর থেকে উপলব্ধির বিষয়--যৌক্তিক ব্যাখ্যার বিষয় নয়।বৌদ্ধিক যুক্তি দ্বারা ঐশ্বরিক একত্বকে অনুধাবন করা সম্ভব নয় বলেই তিনি বিশ্বাস করতেন।
    কিন্তু কবিগুরু এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন যে, সাধারণ কথাবার্তায়,দৈনন্দিন জীবনে, বৌদ্ধিক প্রমাণ এবং যৌক্তিক ব্যাখ্যা একটা ভূমিকা পালন করে।যাদের মধ্যে ঈশ্বরের ব্যক্তিগত উপলব্ধি নেই,যুক্তি-প্রমাণ সকল তাদের মধ্যে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এক জাতীয় শক্তি যোগায়। এটা বুঝেই তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন যাকে 'প্রমাণ' বলা যায়।এই প্রমাণগুলোর কিছু কিছু দর্শনের প্রথাসিদ্ধ প্রমাণের অনুরূপ,আর কিছু কিছু তার নিজের অন্তদর্শন লব্ধ।
    তাঁর অন্যতম প্রিয় ঈশ্বর বিষয়ক প্রমাণ হল,দর্শনের প্রথাসিদ্ধ ভাষায় যাকে বলা হয় উদ্দেশ্য মূলক যুক্তি বা পরিকল্পনা ভিত্তিক যুক্তি।কবি নিজে ছিলেন শৃঙ্খলা এবং সুন্দরের প্রেমিক।স্বাভাবিকভাবেই তাঁর যুক্তির সাক্ষ্যপ্রমাণ এসেছে জগতের শৃঙ্খলা কিভাবে প্রকাশিত হচ্ছে তার উদাহরণ দিয়ে।তিনি 'সৃষ্টির ঐক্য' প্রসঙ্গে লিখেছেন: আমরা অনুভব করি এই জগত এক সৃষ্টি,এর কেন্দ্রে আছে এক জীবন্ত আদর্শ,যা নিজেকে প্রকাশ করছে এক চিরন্তন ঐক্যতানকে, যা  সৃষ্টি হচ্ছে অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রের সহযোগিতায়,প্রত্যেকেই যথাযথ সুরে যাকে বাজাচ্ছে। কবি বিশ্বাস করতেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এক সৃষ্টিকর্তাকে-যে সমগ্র জগতে এক নিয়ম শৃঙ্খলার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।এই বিশ্বজগত কবির কাছে প্রকাশিত হয়েছে 'ঐক্যতান' রূপে।যেখানে সংগীতের সমস্ত মুচ্ছনা প্রকাশ পেয়েছে এক শৃঙ্খলিত আকারে,আর এক অসীম 'সংগীত-সৃষ্টিকারী' ছাড়া এই ঐক্যতানকে ব্যাখ্যা করা যায়না।দর্শনের ছাত্র  একেই উদ্দেশ্যমূলক যুক্তির একটি বিশেষ আকার রূপে চিহ্নিত করতে পারেন।
    একই যুক্তি তিনি অন্যত্র অন্যভাবে উল্লেখ করেছেন।কবি অনুভব করেছেন,এই জগৎ-এ সমগ্রতা ও ঐক্যতা প্রকাশিত হয় পরিণামে। যদিও আপাত বিরোধিতা দেখা যায় বাস্তব ঘটনা সমূহের মধ্যে।যদি আমরা বাহ্যিক বিরুদ্ধ বিষয়গুলিকে বিশ্লেষণ করি,আমরা দেখতে পাবো তাদের মধ্যে এক ধরনের ঐক্য আছে। কবির কাছে এটি খুব উল্লেখযোগ্য বিষয় হিসাবে প্রতিভাত হয়েছে।যেমন,নদীর দুই কুল বাহ্যিকভাবে নদী সীমা নির্ধারণ করে।এই অর্থে নদীর দুই ধারের বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে নদীর দুই কুল। কিন্তু একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায় একটি নদী---নদী ওঠে তার দুই-তীরের জন্যই।নদীর দুই তীরই তাকে বাধ্য করে সামনে এগিয়ে যেতে এবং এভাবেই নদী বেঁচে থাকে।'সাধনা' গ্রন্থে  তিনি এরকম অনুভূতির কথাই বলেছেন।
    তাঁর মতে,ভুল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ফলে আমরা জগতের এক বিকৃত ছবি পাই,আর  একথা অনুভব করতে পারিনা যে বিশ্বব্যাপী এমন এক সত্তা আছে,যে সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে।প্রায় দার্শনিক স্পিনোজার মতো তিনিও বলেছেন সত্য কখনো সাধারন চৈতন্য দ্বারা প্রকাশিত হয় না;এমনকি অংশের চেতনা দ্বারাও সত্য অপ্রকাশিত থেকে যায়।সত্য কেবল প্রকাশিত হয় সমগ্র চেতনা দ্বারা।বেহালার সমস্ত তার থেকে সুন্দর শব্দতরঙ্গকেই বাজানো যায়----কিন্তু একটি তার থেকে বেশুরো আওয়াজই বাজে।সকলেই তারগুলো নাড়াচাড়া করে কিছু শব্দ উৎপাদন করতে পারে।কিন্তু কেবল কয়েকজন প্রতিভাবানরাই পারে সত্যিকারের বেহালাবাদক হতে। সুতরাং এর থেকে তো বলা যাবেনা যে বেহালা তৈরি হয়েছে বিকৃত সুর উৎপাদনের জন্য? কবির এই উপমা বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় তিনি সর্বোচ্চ সত্তার সৃষ্ট ঐক্যকে বুঝতে না পারার জন্য দায়ী করেছেন আমাদের আংশিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই।
    রবীন্দ্র-দর্শনে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণে আর এক ভিন্নশ্রেণীর সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়,যেখানে বলা হচ্ছে সৃষ্টির সমস্ত প্রক্রিয়ার মধ্যেই আনন্দ আছে।প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে এই আনন্দ অনুভবের ক্ষমতা আছে।যদি নেপথ্যে একজন সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস না করা যায় তবে জীবন্ত আনন্দ তত্ত্বের ব্যাখ্যা করা যাবে কিভাবে? এই আনন্দকে অন্য ভাবে ব্যাখ্যা করা যেত,যদি তা কেবল সুখ হতো, যা বিশেষ ব্যক্তিকে বিশেষ সময়ে সন্তুষ্টি দেয়।কিন্তু এই আনন্দ তো সুখ নয়।  এই আনন্দ এক বিশ্বব্যাপী বিষয়---যা প্রকাশকে অতিক্রম করে যায়।'বিশুদ্ধ আনন্দ', রবীন্দ্রনাথের মতে, স্বর্গীয় সুষমামণ্ডিত।
                                    ----------


Wednesday, April 29, 2020

6th Sem Honours Nature of Religion by Rabindranath Tagore

Rabindranath Tagore
Nature of Religion (ধর্মের প্রকৃতি):


    শিশুকাল থেকে ব্রাহ্মসমাজের আবহাওয়ায় রবীন্দ্রনাথ বিকশিত হয়েছেন।তাই তার ধর্ম সম্পর্কিত চেতনায় ব্রাহ্মসমাজের প্রভাবে ছিলই,পরবর্তীকালে হিন্দুত্বের কিছু বিষয়ও যুক্ত হয়েছিল। পরিণত বয়সে তাঁর ধর্ম সম্পর্কিত চেতনা আরো বিস্তার লাভ করে এবং তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিশ্বাস করতেন 'মানবিক ধর্মে' যা 'মানুষের ধর্ম' নামক গ্রন্থে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন,ধর্ম  কখনো গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, উপজাতি, জাতি রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মানুষ ধর্মের বিশেষ একটি আকৃতি গ্রহণ করতে পারে নিজের প্রয়োজন ও সুবিধামতো কিন্তু পরিণামে প্রকৃত ধর্ম সমস্ত বিশেষ আকৃতিকে অতিক্রম করে যায়।
    যে দার্শনিক দর্শনকে সহজ করিয়া দেখাইতে পারেন তিনি যথার্থ ক্ষমতাশালী, ধীশক্তিমান যে সভ্যতা আপনার সমস্ত ব্যবস্থাকে সরলতার দ্বারা সুশৃঙ্খল ও সর্বত্র  সুগম করিয়া আনিতে পারে সেই সভ্যতাই যথার্থ উন্নততর।বাহিরে দেখিতে যেমনই হোক, জটিলতাই দুর্বলতা, তাহা অকৃতার্থতা, পূর্ণতাই সরলতা। ধর্ম সেই পরিপূর্ণতার,সুতরাং সরলতার,একমাত্র চরমতম আদর্শ।
    কিন্তু এমনি আমাদের দুর্ভাগ্য সেই ধর্মকেই মানুষ সংসারের সর্বাপেক্ষা জটিলতা দ্বারা আকীর্ণ করিয়া তুলিয়াছে।তাহা অশেষ তন্ত্রে-মন্ত্রে,কৃত্রিম ক্রিয়াকর্মে, জটিল মতবাদে,বিচিত্র কল্পনায় এমনি গহন দুর্গম হইয়া উঠিয়াছে যে,মানুষের সেই স্বকৃত অন্ধকারময় জটিলতার মধ্যে প্রত্যহ এক একজন অধ্যাবসায়ী এক এক  নতূন পথ কাটিয়া নব নব সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করিতেছে।সেই ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায় ও মতবাদের সংঘর্ষে জগতে  বিরোধ-বিদ্বেষ অশান্তি অমঙ্গলের আর সীমা নাই।
    এমন হইল কেন? ইহার একমাত্র কারণ, সর্বান্তঃকরণে আমরা নিজেকে ধর্মের অনুগত না করিয়া,ধর্মকে নিজের অনুরূপ করিবার চেষ্টা করিয়াছি বলিয়া।ধর্মকে আমরা সংসারের অন্যান্য আবশ্যকদ্রব্যের ন্যায় নিজেদের বিশেষ ব্যবহারযোগ্য করিয়া লইবার জন্য আপন আপন পরিমাপে তাহাকে বিশেষভাবে খর্ব করিয়া লই বলিয়া।
  ধর্ম আমাদের পক্ষে সর্বশ্রেষ্ঠ আবশ্যক সন্দেহ নাই, কিন্তু সেই জন্যই তাহাকে নিজের উপযোগী করিয়া লইতে গেলেই তাহার সর্বশ্রেষ্ঠ আবশ্যকতাই নষ্ট হইয়া যায়।তাহা দেশকালপাত্রের ক্ষুদ্র প্রভেদের অতীত, তাহা নিরঞ্জন বিকারবিহীন বলিয়াই তাহা আমাদের চিরদিনের পক্ষে আমাদের সমস্ত অবস্থার পক্ষে এত একান্ত আবশ্যক। তাহা আমাদের অতীত বলিয়াই তাহা আমাদিগকে নিত্যকাল সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যে ধ্রুব অবলম্বন দান করে।
    রবীন্দ্র-দর্শনে ধর্ম ও দর্শনকে পৃথক করার সমস্যা বিশেষ।দুই-এরই লক্ষ এক।দর্শন হলো 'সত্যের দৃষ্টি' আর ধর্মের লক্ষ্য হল মানব মনে ঐশ্বরিকতার সঙ্গে একত্বের উপলব্ধি।উভয়েই এক এবং অভিন্ন বিষয়কে নির্দেশ করছে।তবে এই 'নিজের সত্যপ্রকৃতির উপলব্ধি' ঐশ্বরিকতার সঙ্গে 'আত্মার একত্ব'  ইত্যাদি বিষয়গুলি বিমুর্ত। অবান্তর বচনের অপব্যাখ্যা যাতে না হয় তার জন্য তিনি নির্দেশ করেছেন ধর্মে 'ভালোবাসা'র কথা।অসীমের উপলব্ধি হঠাৎ করে হওয়া সম্ভব নয়।আমাদের শুরু করতে হবে ভালোবাসা দিয়ে।আমাদের জীবন সম্পর্কে ক্ষুদ্র দৃষ্টিভঙ্গির, আত্মকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে পারে অপরের প্রতি ভালোবাসা। বিশ্ব প্রকৃতির সকল প্রাণী, লতা, বৃক্ষ নদী, প্রান্তরের প্রতি মমত্ববোধ।এই মমত্ববোধই তার মধ্যে জন্ম দেবে এক বিশ্বব্যাপী একত্বের, এক বিশ্বজনীন ধর্মের।
    ভালোবাসা,ত্যাগ,আন্তরিকতা এবং সরলতা এই দিয়ে তৈরি হয় প্রকৃত ধার্মিকের জীবন।রবীন্দ্রনাথ 'নিষ্পাপ ভালোবাসা'র শক্তিতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি বলেছেন,সাংগঠনিক ধর্মের প্রয়োজনীয় জ্ঞান-----ধর্মকেই ধ্বংস করে দেয়। উপমা দিয়ে তিনি বলেছেন,পবিত্র মন্দির থেকে শিশুরা ছুটে পালিয়ে গিয়ে ধুলায় বসে খেলছে, ঈশ্বর ঐ শিশুদের খেলা লক্ষ্য করছেন-----পুরোহিতদের ভুলে গিয়েছেন।
                                   ----------


Sunday, April 26, 2020

6th Sem Honours Nature of Religion by Swami Vivekananda

ধর্মের প্রকৃতি (Nature of Religion): জীবনের প্রয়োজনীয় দিক হিসেবে ধর্ম :
  বিবেকানন্দ বলেন, 'মানব জাতির ভাগ্য গঠনের জন্য যে সমস্ত শক্তি এতকাল কাজ করে এসেছে এখনো কাজ করছে তাদের মধ্যে অধিক প্রভাবশালী শক্তি হল ধর্ম রূপে অভিব্যক্ত শক্তি। সমস্ত রকমের সামাজিক প্রতিষ্ঠানের পেছনে এই অপূর্ব শক্তির কার্যকারিতা বিদ্যমান।আবার  সমস্ত ব্যষ্টিমানবেরর  মধ্যেই সংহতির মহত্তর  প্রেরণা এই শক্তি থেকে উদ্ভূত।একথা সত্য যে অগণিত ক্ষেত্রে ধর্মের যে বন্ধন তা জাতি,জলবায়ু এমনকি বংশের বন্ধন অপেক্ষাও দৃঢ়তর। আর একথাও স্পষ্ট বা সুবিদিত যে, যারা একই ঈশ্বরের উপাসক, একই ধর্মে বিশ্বাসী, তারা একই বংশজাত মানুষদের এমনকি তার ভাইয়ের অপেক্ষা আরো বেশি দৃঢ়তা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে একে অন্যের সাহায্য করেছে।'
  তিনি মনে করেন জীবনে ধর্মের প্রয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন, যেমন অন্ন বস্ত্র বাসস্থান ইত্যাদিকেই  আমরা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন বলে মনে করি।কিন্তু এই সমস্ত দৈহিক জাগতিক প্রয়োজনই জীবনের সবদিক পূরণ করে না। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বিলাসবহুল জীবনের নিরাপত্তা ও আরাম ছেড়েও মানুষ আরো উচ্চতর,আরো শান্তির জীবনের অন্বেষণ করেছে বারে বারে এটাই তার ধর্মের আকাঙ্ক্ষা।
  তিনি বলছেন, 'মানব মনকে গতিশীল করার জন্যে ধর্ম একটি শ্রেষ্ঠ নিয়ামক শক্তি।ধর্ম আমাদের মধ্যে যে পরিমাণ শক্তি সঞ্চার করতে পারে, অন্য কোনো আদর্শ তা পারে না। মানবজাতির ইতিহাস থেকে স্পষ্টতই প্রতীত হয় যে, অতীতে এইরকম হয়েছে এবং ধর্মের শক্তি এখন নিঃশেষিত হয়ে যায়নি। কেবল হিতবাদ অবলম্বন করলেই যে মানুষ খুব সৎ এবং নীতিপরায়ণ হতে পারে তা আমি অস্বীকার করি না। এই জগতে এমন অনেক মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেছেন তারা হিতবাদ অনুসরণ করেও সম্পূর্ণ,নির্দোষ এবং নীতিপরায়ণ ছিলেন।কিন্তু যে সমস্ত মহামানব বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের স্রষ্টা,যারা জগতে যেন চৌম্বক শক্তিরাশি সঞ্চারিত করেন,যাদের শক্তি শত সহস্র ব্যক্তির উপর কাজ করে।যাদের জীবন অপরের জীবনে আধ্যাত্মিক অগ্নি প্রজ্বলিত করে,এইরকম মহাপুরুষদের মধ্যে আমরা সর্বদা আধ্যাত্মশক্তির প্রেরণা দেখতে পাই।তাঁদের প্রেরণা শক্তি ধর্ম থেকে এসেছে।
  যে অনন্ত শক্তিতে মানুষের জন্মগত অধিকার, যা তার প্রকৃতিগত, তা উপলব্ধি করার জন্যে ধর্মই সর্বাপেক্ষা বেশি প্রেরণা দেয়।চরিত্র গঠনে সৎও মহৎ কার্য সম্পাদনে নিজের ও অন্যের জীবনে শক্তি স্থাপনে ধর্ম সর্বোচ্চ প্রেরণা শক্তি সুতরাং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এর অনুশীলন করা উচিত। পূর্বপেক্ষা উদার ভিত্তিতে ধর্মের অনুশীলন আবশ্যক। সর্বপ্রকার সংকীর্ণ, অনুদার ও বিবদমান ধর্ম ভাব দূর করতে হবে। সমস্ত সাম্প্রদায়িক স্বজাতীয় বা স্বগোত্রীয় ভাব পরিত্যাগ করতে হবে। প্রত্যেক জাতীয় গোষ্ঠীর নিজস্ব ঈশ্বর উপাসনা থাকবেন এবং অন্যের ঈশ্বর মিথ্যা-----এই জাতীয় ধারণা কুসংস্কার, এগুলো ভিত্তিহীন। তাই এগুলো অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া উচিত।'
  বিবেকানন্দ মনে করেন, মানব সমাজের ইতিহাস যদি পর্যালোচনা করা যায়,তবে দেখা যায় নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ধর্মের মৃত্যু ঘটেনি কখনও কখনও একে অপ্রোজনীয় বলে জড়বাদীরা বা অতি উৎসাহে তথাকথিত বিজ্ঞানবাদীরা দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন,কিন্তু কিছুদিন পরে আবার ধর্ম স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানব জীবনে।

Saturday, April 18, 2020

SEM II (PHIL HONS) ধারণার সম্বন্ধ ও বস্তুস্থিতি বা বাস্তব ব্যাপার


Philosophy (Hons),
2nd sem

ধারণার সম্বন্ধ বস্তুস্থিতি বা বাস্তব ব্যাপার:
(Relations of ideas and matters of fact)

অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক হিউম তার  'ইনকোয়্যারি 'গ্রন্থে মানুষের সমস্ত জ্ঞানের বিষয় কে দুটি ভাগে বিন্যস্ত করেছেন, যথা - ধারণার সম্বন্ধ এবং বস্তুস্থিতি বা বাস্তব ব্যাপারতার পূর্বে প্রকাশিত তার 'ট্রিটিজ' গ্রন্থেও অনুরুপ বিভাগের উল্লেখ আছেতবে ট্রিটিজ গ্রন্থে হিউম জ্ঞানের বিষয়ের পরিবর্তে দর্শন সম্মত সম্বন্ধ কে দুটি ভাগে বিন্যস্ত করেছেন
 ইনকোয়্যারি গ্রন্থে হিউম যে বিভাগের উল্লেখ করেছেন তা সম্বন্ধের বিভাগ নয়, তা হল জ্ঞানের বিষয় বস্তুর বিভাগবলা যায় এই বিভাগ দুই ধরনের জ্ঞানের এবং জ্ঞানের বিষয়ের বিভাগ  আবার যেহেতু জ্ঞান প্রকাশ পায় বচনে, সেহেতু এমনও বলা যেতে পারে যে এই বিভাগ দুই প্রকার বচনের বিভাগ  এই বিভাগ হিউমের দ্বি-বিভাগতত্ত্ব  নামে পরিচিতবিষয় অনুসারে জ্ঞান দুই প্রকার - ধারণার সংগে ধারণার সম্বন্ধ বিষয়ক জ্ঞান এবং ধারণার সংগে তথ্যের বা ব্যাপারের সম্বন্ধ বিষয়ক জ্ঞানপ্রথম প্রকার জ্ঞানের বা বচনের বিষয় বিমূর্ত ধারনা এবং দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞানের বা বচনের বিষয় মূর্ত তথ্য বা ব্যাপারপ্রথম প্রকার জ্ঞানের বিষয় হল অভিজ্ঞতা নিরপেক্ষ বুদ্ধিলব্ধ প্রত্যয় বা ধারণা এবং দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞানের বিষয় হল অভিজ্ঞতা সাপেক্ষ বাস্তব বিষয়গাণিতিক জ্ঞান হল ধারণার সংগে ধারণার সম্বন্ধ বিষয়ক প্রথম প্রকার জ্ঞান  এজাতীয়  জ্ঞান হিউমের মতে স্বজ্ঞামূলক অথবা প্রমান মূলকতবে গাণিতিক জ্ঞান প্রমান মূলক হলেও তাদের সঠিক অর্থে  স্বজ্ঞামূলক বলা চলে নাহিউম সম্ভবত ন্যায়শাস্ত্রের জ্ঞান কেই স্বজ্ঞামূলক বলেছেনদ্বিতীয় প্রকার বাস্তব বিষয় সংক্রান্ত জ্ঞানের বিষয় হল- ইতিহাস,ভুগোল, রাস্ট্রবিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন প্রভৃতি  অভিজ্ঞতা সাপেক্ষ তথ্যাদি

দুপ্রকার বচনের মধ্যে পার্থক্যঃ
    প্রথম পার্থক্য- ধারণার সংগে ধারণার সম্বন্ধ বিষয়ক জ্ঞান মাত্রই অভিজ্ঞতা নিরপেক্ষ বা পূর্বতঃসিদ্ধহিউমের ভাষায় জাগতিক কোন তথ্য বা বাস্তব বিষয়ের উপর নির্ভর  না করে শুধুমাত্র চিন্তনক্রিয়া বা বুদ্ধিক্রিয়ার মাধ্যমে জাতীয় জ্ঞান বা বচন কে জানা যায়যেমন - অতিভুজের বর্গ ক্ষেত্র হল তার দুই বাহুর বর্গক্ষেত্রের যোগফলের  সমান,পাচের তিনগুন হল ত্রিশের অর্ধেকগাণিতিক বচন মাত্রই এজাতীয়গাণিতিক বচনে কেবল এক ধারণার সংগে অন্য এক ধারণার সম্বন্ধ নিরধারন করা হয়গাণিতিক বচনে জাগতিক কোন তথ্য বা ব্যাপারের উল্লেখ থাকে না এবং সেজন্য অভিজ্ঞতার কোন প্রয়োজন হয় না
 পক্ষান্তরে বস্তুস্থিতি বা বাস্তব বিষয়ের জ্ঞান কেবল বুদ্ধিক্রিয়ার মাধ্যমে লাভ করা যায় না, বস্তুস্থিতি- বিন্যাস কে জানার জন্য অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন হয়কাজেই জাতীয় জ্ঞান বা বচন পূর্বতঃসিদ্ধ নয়, তা অভিজ্ঞতা  সাপেক্ষ বা পরতঃ সাধ্যহিউম এজাতীয় জ্ঞানের যে উদাহরণ  দিয়েছেন  তা হল - আগামীকাল সূর্য পূর্ব দিকে উঠবে অথবা উঠবে না  আগামীকাল সূর্য পূর্ব দিকে উঠবে কী উঠবে না - তা ধারণাগত সম্বন্ধ নিরধারন করে অথবা শব্দপ্রতীকের অর্থ বিশ্লেষণ করে জানা যায় না, তা জানতে হলে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়

দ্বিতীয় পার্থক্যঃ  ধারণার সংগে ধারণার সম্বন্ধ বিষয়ক জ্ঞান অস্বীকার করলে তা হয় স্ববিরোধী জ্ঞান, জাতীয় জ্ঞান বা বচনের নিষেধ বচন চিন্তা করাই যায়  না এবং সংখ্যা দুটির অর্থ জানা থাকলে '+= ' এই বচনটির নিষেধ চিন্তা করাই যায় নাএমন চিন্তা করলে চিন্তার জগতে স্ববিরোধিতা  দেখা দেয়এজাতীয় গাণিতিক বচন স্বতঃসত্য বচন এবং ফলত এজাতীয় বচনের নিষেধ বচন স্বতঃমিথ্যা বচন
      পক্ষান্তরে বস্তুস্থিতি  বা বাস্তব বিষয়ের জ্ঞান এমন নয়,কেননা এজাতীয় জ্ঞানের বিপরীত জ্ঞান স্ববিরোধী হয় না, এজাতীয় জ্ঞানের  নিষেধ করলে চিন্তার জগতে কোন বিরোধিতা দেখা দেয় নাআগামীকাল সূর্য  উঠবে - এই ইতিবাচক বচনটার মতোই আগামীকাল সূর্য উঠবে না-  এই নিধেধ বচনটিও আমাদের কাছে স্পষ্ট এবং বিরোধহীন রুপে অনুভূত হয়কথাটির মাধ্যমে হিউম এমন বলেন না যে - আগামীকাল সূর্য উঠবে কথাটি মিথ্যাতিনি কেবল  এটাই বলেন যে - আগামীকাল সূর্য  উঠবে না - এমন চিন্তার মধ্যে কোন যৌক্তিক  বিরোধিতা  নেই

গুরুত্ব   হিউম উল্লিখিত বচনের দুপ্রকার বিভাগ দর্শণের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পূর্ণপ্রথম প্রকার ধারণার সম্বন্ধ বিষয়ক পূর্বতঃসিদ্ধ বচন কে আধুনিক পরিভাষায় বলা হয় বিশ্লেষক বচন, আর দ্বিতীয় প্রকার বাস্তব বিষয় সংক্রান্ত পরতঃসাধ্য বচনকে আধুনিক পরিভাষায় বলা হয় সংশ্লেষক  বচনসাম্প্রতিককালের ন্যায়গত প্রত্যক্ষবাদীদের মতে পূর্বতঃসিদ্ধ বচন মাত্রই বিশ্লেষক অনিবার্যরুপে সত্য এবং পরতঃসাধ্য বচনমাত্রই সংশ্লেষক, প্রকার সংশ্লেষক বচনের নিষেধ বচন বাস্তবত মিথ্যা হলেও স্ববিরোধী হয় নাএই দুই প্রকার বচন ছাড়া মধ্যবর্তী  আর কোন বচন নেই